আব্দুল বাছিত খান,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারে দিন দিন বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দলবদ্ধ আড্ডা, মারামারি, ছিনতাই, ইভটিজিং, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হামলার অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কিশোরদের একটি অংশ মাদক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক বিরোধ এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের মতো কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মৌলভীবাজার শহরে কিশোর গ্যাংকে কেন্দ্র করে একাধিক ঘটনা জনমনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। গত ১৩ আগস্ট শহরের কুসুমবাগ এলাকায় পূর্ববিরোধের জেরে এক মাদ্রাসাছাত্রের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ এ ঘটনায় দুজনকে আটক করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে কিশোর গ্যাং ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে কথিত এক গ্যাং-হোতাকে গ্রেপ্তার করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি আদালতের বিষয়।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে স্থানীয় নাগরিকরা ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছেন। ১৬ আগস্ট মৌলভীবাজারে কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি পালিত হয়। এতে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এবং শহরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
কেন বাড়ছে কিশোর অপরাধ?
সচেতন মহলের মতে, পরিবারে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, মাদকের বিস্তার, বেকারত্ব, সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়, প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই কিশোরদের চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
যা করা প্রয়োজন
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রশাসন, পুলিশ, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সচেতন নাগরিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রথমত, শহরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত পুলিশি টহল ও বিট পুলিশিং জোরদার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, চলাফেরা এবং অপরাধপ্রবণতার বিষয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তৃতীয়ত, মাদকের বিস্তার রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং কিশোরদের মাদক সরবরাহকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম ও শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে কিশোরদের সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের জন্য নিরাপদ বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
পঞ্চমত, কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করছে এমন প্রাপ্তবয়স্ক ‘বড় ভাই’ বা পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু কিশোরদের আটক করে মূল হোতাদের বাইরে রাখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ষষ্ঠত, শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের প্রতি প্রত্যাশা
মৌলভীবাজারবাসীর প্রত্যাশা—কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান যেন বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক না হয়। অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
কিশোররা সমাজের বোঝা নয়, তারাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিপথে যাওয়া কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও জরুরি। সম্মিলিত উদ্যোগেই মৌলভীবাজারকে কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসমুক্ত, নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি
Leave a Reply